মহালয়া আর দুৰ্গা পুজো : আমার সেকাল

Durga Puja 2020: Here's why there is a gap between Mahalaya and Shashthi |  Books News – India TV

(Picture Courtesy: Google) 

আজ মহালয়া, দেবী পক্ষের সূচনা কিন্তু আজ আশ্বিন মাসের শারদ সকাল বা সন্ধ্যে নয়, এই মহালয়াতে  পুজো পুজো গন্ধ আসেনি কারণ দুর্গা পুজো আসবে এক মাস বাদে | কিন্তু মহালয়া আশা মানেই ছোটবেলার অনেক কিছু স্মৃতি চোখের সামনে পর পর ভেসে উঠলো |

তখন আমরা,মানে আমি আর আমার ভাই, (৭/৮ বছর বয়েস) দাদু আর বাবার কাছে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রর  চন্ডীপাঠের গল্প শুনেছি | সেটা নিজের কানে সোনার সৌভাগ্য হয়েছিল আকাশবাণী কলকাতাতে | আগের রাতে রেডিও স্টেশন tune করে ঘড়িতে alarm সেট করে ঘুমোতে যাওয়া, শোওয়ার আগে বার  বার  reminder দেয়া মাকে "কাল কিন্তু ডেকে দেবে শুনবো |" ভোর ৪-টের অ্যালার্ম, প্রায় ঘুমিয়ে  ঘুমিয়ে রেডিওটা ও করে আবার বিছানায়, কিন্তু কান একেবারে রেডিওর দিকে......ঘুম কখন কেটে যেত  বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে, টের পেতাম না | ঠিক ৫টাতে TV তে Doordarshan এ মহালয়া দেখার ইচ্ছে আরো বেড়ে যেত রেডিও শুনতে শুনতে, কারণ এতক্ষণ যা শুনেছি সেটা  চাক্ষুষ দেখাও চাই, তাই brush করে সোজা টিভির সামনে | তার সাথে বোনাস ছিল মায়ের হাতের coffee .... ওই একদিন coffee খাওয়ার স্বাধীনতা ছিল ছোটদের | Coffee খেতে খেতে মহালয়া দেখার আমেজই  আলাদা | মহালয়া এলেই মোটামুটি বই খাতা drawer এর কোনায় ঢুকিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু  হয়ে যেত.... আমি চিরকাল ফাঁকিবাজ, তাই আমার তারা ছিলো বেশি, মহালয়া থেকেই নানা অজুহাত খুঁজতে শুরু   করতাম পড়তে না বসার | কারণটা বলি.....আমাদের বাড়ি ছিল কালীঘাটে, কালী মন্দির  ছিল ১৫ মিনিট হাঁটাপথ..... prime লোকেশন...একদিকে Rashbehari Avenue, আর অন্যদিকে Hazra Road....বাড়ির 50m radius এ হতো ৫টা পুজো.....পুরো জমজমাট পরিবেশ |

বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে 'আপনজন' বলে একটা দোকান ছিল, এখনো আছে, সেখানে চিকেন  কবিরাজি, চিকেন কাটলেট, মটন সিঙ্গারা, মোঘলাই পরোটার যে কত item ছিল.....ভাবলেই জ্বীভে জল  এসে যায় | বাড়ির নিচ্ছে  'অন্নপূর্ণা মিষ্টান্ন ভান্ডার' | মহালয়া থেকেই তাই আমাদের আমাদের পেট পুজোর planning শুরু |

বাড়ির যেহেত পঞ্চ পুজোর কেন্দ্রবিন্দু তাই, ৫টা Loud Speaker .... একদিকে কিশোরে কুমারের "নয়নও সরসী", তো অন্যদিকে কুমার শানুর "তুমি এলে না কেন এলে না " বা আরেকদিকে আশা ভোঁসলের "খেলবো হোলি রং দেবো না" বা নির্মলা মিশ্রর "এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না" ......সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি গান কিন্তু তখন এতো আনন্দ হতো.......কখন মাইক বাজবে..... আজ ও ঠিক তেমন মনে হয়.... ইস যদি ওই ছোটবেলাটা ফিরে যেতে পারতাম কি যে মজা হতো | পুজোর ৪টে দিন পুরো রাস্তা জুড়ে নানারকম ছোট  food stall , gas balloon, আঁখের juice আর সেই  cold drinks এর bottle এ ট্রিং-ট্রিং শব্দ.....সারা রাত ওই আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম  খেয়াল থাকত না |

পুজোর দিন গুলোতে সন্ধের আগে মোটামুটি পুজো দেখার পর্ব সেরে নিতাম যাতে বিকেলে জানালার  পাশে  বা বাড়ির  নীচে রোয়াকে বসে লোকজনের সমাগম, আলো ঝলমলে বাড়িগুলো, কাঁচের বোতলের  ট্রিং-ট্রিং, আঁখের রসের মেশিনের ঘুনঘুন....সেগুলো যেন আজ কানে ভাসে | এই সবের মধ্যে দিয়ে  কখন যে পুজো ফুরিয়ে যেত বুঝতেই পারতাম  না.......দশমীর দিন মন এতো খারাপ হয়ে যেত যে মাঝে  মাঝে কান্না পেতো, কেঁদেও ফেলতাম অনেক সময়, কারণ একটাই, এখন ভাবলে হাঁসি পায় যদিও, আবার  সেই বই খাতা নিয়ে বসতে হবে, ভাই-ফোঁটার পর half-yearly exam...তখন কি আর ভালো লাগে ?

ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সাথে সাথে পুজো দেখার আনন্দটা একটু বদলেছিলো......একই আনন্দ ছিল, কিন্তু  মাইক গান বদলে গেছিলো | মন তখন খারাপ হতো আজ হয় কিন্তু এই সুদূর মুম্বাই-তে  বসে সেই  ছোটবেলাটা খুঁজে পাইনা | এখানে অনেক পুজো হয়, অনেক cultural অনুষ্ঠান হয়ভীষণ  ভালো  লাগে মিনি-কলকাতাকে ..... কিন্তু আমি এখনো সেই কালীঘাটে ফিরে যেতে চাই ...... সেই  পুরোনো স্মৃতিগুলো অলিগলি দিয়ে কখন যে চোখের সামনে ভেসে আসে .....মনে হয় স্বপ্ন দেখছি |

কাল রাতে আমার ছেলে Rian কে মহালয়া ঠিক কি সেটা বোঝাতে গিয়ে ছোটবেলার কথায় চলে  গেছিলাম, মুখে smile ছিল আর  Rian অবাক হয়ে হেঁসে হেঁসে শুনছিলো  আর অনেক প্রশ্ন করছিলো | কাল ছেলের হাত ধরে চলে গেছিলাম আমাদের মহালয়া আর দুর্গা পুজোর সেই দিনগুলোতে যেগুলো  হয়তো আজ আছে কিন্তু সেই পুরোনো গন্ধটা  আর পাইনা !!!

Comments